একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়ার তালিকা ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো একতা এক্সপ্রেস। আপনি যদি ঢাকা থেকে পঞ্চগড় কিংবা পঞ্চগড় থেকে ঢাকা অভিমুখে আরামদায়ক ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই ট্রেনটি তার দ্রুতগতি এবং উন্নত সেবার জন্য দীর্ঘকাল ধরে যাত্রীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। আজকের এই ব্লগে আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী একতা এক্সপ্রেসের সময়সূচী, বর্তমান টিকেট মূল্য, বিরতি স্টেশন ও অনলাইনে টিকেট কাটার নিয়ম নিয়ে আলোচনা করব।
একতা এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য
একতা এক্সপ্রেস (ট্রেন নং ৭০৫/৭০৬) বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেন। এটি মূলত ঢাকা থেকে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় পর্যন্ত চলাচল করে। ১৯৮৬ সালে ট্রেনটি যখন প্রথম যাত্রা শুরু করে, তখন এর গন্তব্য ছিল দিনাজপুর পর্যন্ত। পরবর্তীতে যাত্রীদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ২০১৮ সালে এর রুট পঞ্চগড় (বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেলওয়ে স্টেশন) পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এটি একটি ব্রডগেজ ট্রেন এবং বর্তমানে এটি আধুনিক ইন্দোনেশিয়ান কোচ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
একতা এক্সপ্রেস মূলত তার গতির জন্য পরিচিত। বঙ্গবন্ধু সেতু ব্যবহারের মাধ্যমে এটি অত্যন্ত অল্প সময়ে যমুনা নদী পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। ট্রেনটিতে এসি বার্থ, এসি চেয়ার এবং শোভন চেয়ারের মতো বিভিন্ন ক্যাটাগরির আসন ব্যবস্থা রয়েছে, যা সব শ্রেণির যাত্রীদের জন্য সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক।
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬
একটি সফল ভ্রমণের প্রধান শর্ত হলো সঠিক সময়ে স্টেশনে উপস্থিত থাকা। একতা এক্সপ্রেস ঢাকা এবং পঞ্চগড় উভয় প্রান্ত থেকেই প্রতিদিন যাতায়াত করে। নিচে ট্রেনটির বর্তমান সময়সূচী একটি ছকের মাধ্যমে প্রদান করা হলো:
| রুট | ট্রেনের নম্বর | ছাড়ার সময় | পৌঁছানোর সময় | সাপ্তাহিক ছুটি |
| ঢাকা থেকে পঞ্চগড় | ৭০৫ | সকাল ১০:১০ | রাত ০৯:০০ | নেই |
| পঞ্চগড় থেকে ঢাকা | ৭০৬ | রাত ০৯:১০ | সকাল ০৮:১০ | নেই |
বিঃদ্রঃ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিশেষ প্রয়োজনে বা কারিগরি কারণে সময়সূচী কিছুটা পরিবর্তন করতে পারে। তাই যাত্রার আগে অবশ্যই সর্বশেষ সময় যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় একতা এক্সপ্রেস বিরতি স্টেশন ও সময়
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যাওয়ার পথে একতা এক্সপ্রেস অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। যাত্রীরা তাদের সুবিধামতো এসব স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠতে বা নামতে পারেন। নিচে ঢাকা থেকে পঞ্চগড় অভিমুখে ট্রেনটির বিরতি স্টেশনগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
| স্টেশনের নাম | পৌঁছানোর সময় | ছাড়ার সময় |
| ঢাকা (কমলাপুর) | — | সকাল ১০:১০ |
| ঢাকা বিমানবন্দর | সকাল ১০:৩৫ | সকাল ১০:৪০ |
| জয়দেবপুর | সকাল ১১:০৫ | সকাল ১১:১০ |
| টাঙ্গাইল | দুপুর ১২:০৫ | দুপুর ১২:০৭ |
| সিরাজগঞ্জ (মনসুর আলী) | দুপুর ১২:৪৫ | দুপুর ১২:৪৭ |
| উল্লাপাড়া | দুপুর ০১:০৫ | দুপুর ০১:০৭ |
| ঈশ্বরদী বাইপাস | দুপুর ০২:১০ | দুপুর ০২:১২ |
| নাটোর | দুপুর ০২:৫০ | দুপুর ০২:৫৩ |
| সান্তাহার | বিকাল ০৩:৫৮ | বিকাল ০৪:০৩ |
| আক্কেলপুর | বিকাল ০৪:২৪ | বিকাল ০৪:২৬ |
| জয়পুরহাট | বিকাল ০৪:৪৮ | বিকাল ০৪:৫১ |
| পাঁচবিবি | বিকাল ০৫:০৮ | বিকাল ০৫:১০ |
| বিরামপুর | বিকাল ০৫:৩০ | বিকাল ০৫:৩৩ |
| ফুলবাড়ী | বিকাল ০৫:৪৫ | বিকাল ০৫:৪৮ |
| পার্বতীপুর জংশন | সন্ধ্যা ০৬:১৫ | সন্ধ্যা ০৬:২৫ |
| চিরিরবন্দর | সন্ধ্যা ০৬:৪১ | সন্ধ্যা ০৬:৪৩ |
| দিনাজপুর | সন্ধ্যা ০৭:০০ | সন্ধ্যা ০৭:০৮ |
| সেতাবগঞ্জ | সন্ধ্যা ০৭:৩৮ | সন্ধ্যা ০৭:৪০ |
| পীরগঞ্জ | রাত ০৭:৫৫ | রাত ০৭:৫৭ |
| ঠাকুরগাঁও রোড | রাত ০৮:২০ | রাত ০৮:২৩ |
| রুহিয়া | রাত ০৮:৩৮ | রাত ০৮:৪০ |
| পঞ্চগড় | রাত ০৯:০০ | — |
পঞ্চগড় থেকে ঢাকা একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী
বিপরীত রুটে অর্থাৎ পঞ্চগড় থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যখন ট্রেনটি ছেড়ে আসে, তখন এর সময় কিছুটা ভিন্ন থাকে। এটি মূলত একটি নৈশকালীন ট্রেন হিসেবে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে।
| স্টেশনের নাম | পৌঁছানোর সময় | ছাড়ার সময় |
| পঞ্চগড় (বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম) | — | রাত ০৯:১০ |
| ঠাকুরগাঁও রোড | রাত ০৯:৩৭ | রাত ০৯:৪০ |
| দিনাজপুর | রাত ১০:৫৫ | রাত ১১:০৩ |
| পার্বতীপুর | রাত ১১:৩৮ | রাত ১১:৪৮ |
| সান্তাহার | রাত ০১:৫৫ | রাত ০২:০০ |
| নাটোর | রাত ০২:৪০ | রাত ০২:৪৩ |
| উল্লাপাড়া | ভোর ০৪:১১ | ভোর ০৪:১৪ |
| টাঙ্গাইল | ভোর ০৫:১৩ | ভোর ০৫:১৫ |
| জয়দেবপুর | সকাল ০৬:১৫ | সকাল ০৬:২০ |
| ঢাকা বিমানবন্দর | সকাল ০৬:৫০ | সকাল ০৬:৫৫ |
| ঢাকা (কমলাপুর) | সকাল ০৮:১০ | — |
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট মূল্য ২০২৬
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়া বাসের তুলনায় অনেকটাই কম এবং এটি বেশ নিরাপদ। আসন ভেদে ভাড়ার তারতম্য হয়ে থাকে। নিচে ঢাকা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির টিকেটের মূল্য দেওয়া হলো:
| আসনের ধরণ | টিকেটের মূল্য (ভ্যাটসহ) |
| শোভন চেয়ার | ৭৬০ টাকা |
| স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) | ১৪২০ টাকা |
| এসি বার্থ/স্লিপার | ১৭০০ টাকা |
টিপস: আপনি যদি মাঝপথের কোনো স্টেশনে নামতে চান, তবে ভাড়ার পরিমাণ আরও কম হবে। রেলওয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে আপনি যে কোনো রুটের সঠিক ভাড়া দেখে নিতে পারবেন।
অনলাইনে টিকেট কাটার সহজ নিয়ম
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের অধিকাংশ টিকেট অনলাইনে বিক্রি হয়। একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কাটার জন্য আপনাকে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
- প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকেটিং ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) অথবা ‘Rail Sheba’ অ্যাপে প্রবেশ করুন।
- আপনার মোবাইল নম্বর এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন (অ্যাকাউন্ট না থাকলে এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে নিন)।
- ‘From Station’ এ আপনার যাত্রার শুরুর স্টেশন এবং ‘To Station’ এ গন্তব্য স্টেশনের নাম লিখুন।
- যাত্রার তারিখ এবং পছন্দের ক্লাস (শোভন, স্নিগ্ধা ইত্যাদি) সিলেক্ট করে ‘Find Tickets’ বাটনে ক্লিক করুন।
- একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি খুঁজে বের করে আপনার পছন্দের আসন সিলেক্ট করুন।
- বিকাশ, নগদ বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট সম্পন্ন করলেই আপনার ই-টিকেটটি ডাউনলোড করার অপশন পাবেন।
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের বিশেষ সুবিধাসমূহ
কেন আপনি একতা এক্সপ্রেস ট্রেনকে আপনার ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে বেছে নেবেন? এর কিছু বিশেষ কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
- নিরাপদ ভ্রমণ: রেলপথে দুর্ঘটনা বা যানজটের ঝুঁকি বাসের তুলনায় অনেক কম।
- খাবার ব্যবস্থা: ট্রেনের ভেতরে একটি নির্ধারিত খাবার বগি বা ক্যানটিন রয়েছে, যেখানে সুলভ মূল্যে চা, কফি, নাস্তা এবং ভারী খাবার পাওয়া যায়।
- প্রার্থনার স্থান: ট্রেনে নামাজ পড়ার জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ থাকে।
- পরিচ্ছন্নতা: বর্তমানে এই ট্রেনের বগিগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়।
- চার্জিং পয়েন্ট: এসি কোচগুলোতে মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার সুবিধা রয়েছে।
- নিরাপত্তা কর্মী: যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তায় ট্রেনে সার্বক্ষণিক রেলওয়ে পুলিশ বা আনসার সদস্য নিয়োজিত থাকেন।
একতা এক্সপ্রেস ভ্রমণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস
- ট্রেনের টিকেট সাধারণত ১০ দিন আগে থেকে কেনা যায়। জনপ্রিয় এই ট্রেনের টিকেট পেতে হলে অন্তত ৫-৭ দিন আগে টিকেট কেটে রাখা ভালো।
- স্টেশনে ট্রেনের নির্ধারিত সময়ের অন্তত ২০-৩০ মিনিট আগে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করুন।
- আপনার সাথে থাকা মালামাল নিজ দায়িত্বে সাবধানে রাখুন।
- অনলাইনে টিকেট কাটলে সেটি প্রিন্ট করে অথবা মোবাইলে পিডিএফ কপি হিসেবে সংরক্ষণ করুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
একতা এক্সপ্রেস কি প্রতিদিন চলে?
হ্যাঁ, একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি সপ্তাহের ৭ দিনই ঢাকা ও পঞ্চগড়ের মধ্যে যাতায়াত করে। এর কোনো অফ-ডে বা সাপ্তাহিক ছুটি নেই।
ট্রেনটি ঢাকা থেকে পঞ্চগড় পৌঁছাতে কত সময় নেয়?
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় পৌঁছাতে একতা এক্সপ্রেসের প্রায় ১০ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগে। তবে মাঝে মাঝে কুয়াশা বা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কিছুটা দেরি হতে পারে।
ট্রেনের টিকেট কি স্টেশনে পাওয়া যায়?
অনলাইনে টিকেট বিক্রি হওয়ার পর যদি আসন খালি থাকে, তবে স্টেশনে কাউন্টার থেকে টিকেট সংগ্রহ করা যায়। তবে একতা এক্সপ্রেসের টিকেট অনলাইনে দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
একতা এক্সপ্রেস কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম নিরাপদ ট্রেন। রেলওয়ে পুলিশ এবং সিসিটিভি (কিছু কোচে) নজরদারির কারণে এটি বেশ নিরাপদ।
শিশুদের টিকেটের নিয়ম কী?
৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য টিকেটের প্রয়োজন হয় না, তবে তাদের জন্য আলাদা আসন বরাদ্দ থাকবে না। ৫ বছরের উপরে হলে পূর্ণ টিকেট কাটতে হবে।
শেষ কথা
একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ও টিকেট মূল্য সম্পর্কে এই বিস্তারিত গাইডটি আশা করি আপনার উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে সহায়ক হবে। ঢাকা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে একতা এক্সপ্রেসের চেয়ে ভালো বিকল্প খুব কমই আছে। ট্রেনের মনোরম পরিবেশ এবং যমুনার ওপর দিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলবে। আপনার যাত্রা শুভ এবং নিরাপদ হোক। রেল ভ্রমণ সংক্রান্ত আরও তথ্যের জন্য আমাদের সাথেই থাকুন।



