সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়া ২০২৬
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী এবং ভাড়ার সঠিক তালিকা সম্পর্কে জানা থাকলে আপনার উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ ভ্রমণ অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ রেলওয়ের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর মধ্যে সীমান্ত এক্সপ্রেস (৭৪৭/৭৪৮) একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন। এটি নিয়মিতভাবে শিল্প শহর খুলনা থেকে নীলফামারীর সীমান্তঘেঁষা স্টেশন চিলাহাটি পর্যন্ত চলাচল করে। দীর্ঘ এই রেলপথে শত শত যাত্রী প্রতিদিন যাতায়াত করেন। আপনি যদি ২০২৬ সালে এই ট্রেনে ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন তাহলে আজকের এই পোস্টটি আপনার জন্য। এই পোষ্টে আজ আমরা আমরা ট্রেনের নতুন সময়সূচী, বর্তমান ভাড়ার তালিকা্র ও টিকিট কাটার আধুনিক নিয়ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেন ও রুট পরিচিতি
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিম জোনের একটি অন্যতম প্রধান ট্রেন হলো সীমান্ত এক্সপ্রেস। খুলনা থেকে যাত্রা শুরু করে এটি যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, জয়পুরহাট এবং দিনাজপুর জেলা স্পর্শ করে নীলফামারীর চিলাহাটি পর্যন্ত যায়। এই রুটটি মূলত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে উত্তরাঞ্চলের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। বাসে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া যেমন ক্লান্তিকর তেমনি ব্যয়বহুল। সেই তুলনায় ট্রেনে ভ্রমণ অনেক বেশি নিরাপদ এবং আরামদায়ক। বিশেষ করে যারা পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করেন বা ছাত্রছাত্রী হিসেবে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত করেন তাদের প্রথম পছন্দ হলো সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেন । এই ট্রেনটি শুধু যাত্রীরা পরিবহন করে না বরং উত্তরবঙ্গের কৃষিজাত পণ্য এবং দক্ষিণবঙ্গের শিল্পজাত পণ্য আদান-প্রদানে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে।
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে এবং সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখতে প্রায়ই সময়সূচী পরিমার্জন করে। সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের নতুন সময়সূচী অনুযায়ী এটি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। নিচে উভয় দিকের বিস্তারিত সময়সূচী প্রদান করা হলো।
খুলনা টু চিলাহাটি সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬
সীমান্ত এক্সপ্রেস (৭৪৭) ট্রেনটি প্রতিদিন রাতে খুলনা জংশন থেকে চিলাহাটির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। রাতের এই যাত্রাটি অনেক যাত্রীর কাছে প্রিয় কারণ তারা ঘুমিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারেন।
- খুলনা জংশন থেকে ছাড়ার সময়: রাত ৯ টা ১৫ মিনিট।
- চিলাহাটি স্টেশনে পৌঁছানোর সময়: সকাল ৬ টা ৪৫ মিনিট।
নিচে খুলনা থেকে চিলাহাটি যাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর সময়সূচী তুলে ধরা হলো:
| স্টেশনের নাম | পৌঁছানোর সময় |
| খুলনা জংশন | রাত ০৯:১৫ (প্রস্থান) |
| দৌলতপুর | রাত ০৯:২৭ |
| নোয়াপাড়া | রাত ০৯:৫২ |
| যশোর | রাত ১০:২৩ |
| মোবারকগঞ্জ | রাত ১০:৫৪ |
| কোটচাঁদপুর | রাত ১১:০৮ |
| দর্শনা হল্ট | রাত ১১:৩৫ |
| চুয়াডাঙ্গা | রাত ১১:৫৭ |
| আলমডাঙ্গা | রাত ১২:১৬ |
| পোড়াদহ | রাত ১২:৩৪ |
| ভেড়ামারা | রাত ১২:৫৪ |
| ঈশ্বরদী | রাত ০১:২০ |
| নাটোর | রাত ০২:০৭ |
| সান্তাহার | ভোর ০৩:০৫ |
| আক্কেলপুর | ভোর ০৩:৩০ |
| জয়পুরহাট | ভোর ০৩:৪৬ |
| বিরামপুর | ভোর ০৪:১৭ |
| ফুলবাড়ী | ভোর ০৪:৩০ |
| পার্বতীপুর | ভোর ০৪:৫০ |
| সৈয়দপুর | সকাল ০৫:১৭ |
| নীলফামারী | সকাল ০৫:৪১ |
| ডোমার | সকাল ০৬:০১ |
| চিলাহাটি | সকাল ০৬:৪৫ (গন্তব্য) |
চিলাহাটি টু খুলনা সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী
বিপরীত দিকে অর্থাৎ চিলাহাটি থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে যে ট্রেনটি (৭৪৮) চলাচল করে, তার সময়সূচীও বেশ গোছানো। এটি সন্ধ্যাবেলা চিলাহাটি থেকে যাত্রা শুরু করে ভোরবেলা খুলনায় পৌঁছায়।
- চিলাহাটি জংশন থেকে ছাড়ার সময়: সন্ধ্যা ৬ টা ৩০ মিনিট।
- খুলনা জংশনে পৌঁছানোর সময়: ভোর ৪ টা ১০ মিনিট।
যাত্রাপথের প্রধান স্টেশনগুলোর সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:
- চিলাহাটি জংশন: সন্ধ্যা ০৬:৩০ মিনিট
- ডোমার: সন্ধ্যা ০৬:৪৮ মিনিট
- নীলফামারী: সন্ধ্যা ০৭:১০ মিনিট
- সৈয়দপুর: সন্ধ্যা ০৭:২৯ মিনিট
- পার্বতীপুর: সন্ধ্যা ০৭:৫০ মিনিট
- জয়পুরহাট: রাত ০৯:১৫ মিনিট
- সান্তাহার: রাত ১০:০০ মিনিট
- নাটোর: রাত ১০:৪০ মিনিট
- ঈশ্বরদী: রাত ১১:২০ মিনিট
- চুয়াডাঙ্গা: রাত ০১:০০ মিনিট
- যশোর: রাত ০২:৪১ মিনিট
- খুলনা জংশন: ভোর ০৪:১০ মিনিট
(উল্লেখ্য: মাঝখানের ছোট ছোট স্টেশনে ট্রেনটি মাত্র ১ থেকে ২ মিনিট বিরতি দেয়, তাই দ্রুত ওঠা-নামা করা জরুরি।)
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়া ২০২৬
ট্রেনের ভাড়া মূলত আপনি কোন শ্রেণিতে বা ক্যাটাগরিতে ভ্রমণ করবেন তার ওপর নির্ভর করে। সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে বিভিন্ন শ্রেণির আসন ব্যবস্থা রয়েছে যাতে সব আয়ের মানুষ ভ্রমণ করতে পারেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক নির্ধারিত ২০২৬ সালের ভাড়ার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| আসন বিভাগ (Seat Category) | টিকিটের মূল্য (Ticket Price) |
| শোভন চেয়ার (Shuvon Chair) | ৫৭৫ টাকা |
| স্নিগ্ধা (Snigdha / AC Chair) | ১১০৪ টাকা |
| ১ম বার্থ (1st Birth) | ১৩২৩ টাকা |
| এসি বার্থ (AC Birth) | ১৯৭৮ টাকা |
সতর্কতা: এই ভাড়ায় ১৫% ভ্যাট এবং অনলাইন চার্জ যুক্ত হতে পারে যদি আপনি অনলাইন থেকে টিকিট ক্রয় করেন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় ভাড়া পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে তাই টিকিট কাটার সময় বর্তমান মূল্য দেখে নেওয়া ভালো।
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের বন্ধের দিন (Off Day)
যেকোনো আন্তঃনগর ট্রেনের মতো সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনেরও একটি নির্দিষ্ট বন্ধের দিন রয়েছে। ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মীদের বিশ্রামের জন্য সপ্তাহে একদিন এই ট্রেন চলাচল করে না।
- সীমান্ত এক্সপ্রেস অফ ডে: প্রতি সপ্তাহের সোমবার।
অর্থাৎ, সোমবার বাদে সপ্তাহের বাকি ৬ দিন এই ট্রেনটি নিয়মিতভাবে তার রুট ম্যাপ অনুযায়ী চলাচল করে। আপনার ভ্রমণের তারিখ যদি সোমবার হয় তবে আপনাকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের বর্তমান অবস্থান জানার উপায়
ট্রেনটি বর্তমানে কোথায় আছে বা কতটুকু লেট করছে তা জানতে এখন আর স্টেশনে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয় না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপনি ঘরে বসেই ট্রেনের লাইভ লোকেশন জানতে পারবেন।
এসএমএস (SMS) পদ্ধতি:
আপনার মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করুন: TR 747 (খুলনা টু চিলাহাটি) অথবা TR 748 (চিলাহাটি টু খুলনা) এবং পাঠিয়ে দিন ১৬৩১৮ নাম্বারে। ফিরতি মেসেজে আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হবে ট্রেনটি এখন কোন স্টেশনে আছে এবং আপনার স্টেশনে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ সময় লাগতে পারে।
ট্রেনের টিকিট কাটার আধুনিক নিয়ম
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট আপনি দুইভাবে সংগ্রহ করতে পারেন। আপনার সুবিধার কথা চিন্তা করে নিচে উভয় পদ্ধতি আলোচনা করা হলো:
১. অনলাইন টিকিট বুকিং পদ্ধতি
বর্তমান সময়ে অনলাইনে টিকিট কাটাই সবচেয়ে সহজ এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি।
- প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) অথবা ‘Rail Sheba’ অ্যাপে প্রবেশ করুন।
- আপনার এনআইডি (NID) কার্ড দিয়ে অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই করে নিন।
- যাত্রা শুরুর স্টেশন এবং গন্তব্য স্টেশনের নাম নির্বাচন করুন।
- ভ্রমণের তারিখ এবং পছন্দের সিট ক্যাটাগরি সিলেক্ট করুন।
- বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন।
- পেমেন্ট শেষে ই-টিকিট ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন অথবা মোবাইলে পিডিএফ সংরক্ষণ করুন।
২. কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা
আপনি যদি অনলাইনে টিকিট কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করেন, তবে সরাসরি রেলস্টেশনের কাউন্টারে চলে যান। সেখানে আপনার গন্তব্য এবং তারিখ বললে বুকিং সহকারী আপনাকে টিকিট দিয়ে দেবেন। তবে মনে রাখবেন, উৎসবের সময় বা ছুটির দিনে টিকিটের প্রচুর চাহিদা থাকে, তাই অন্তত ৫ থেকে ১০ দিন আগে টিকিট কেটে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
যাত্রী সাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু টিপস
একটি নিরাপদ ও আনন্দদায়ক রেল ভ্রমণের জন্য আপনাকে কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস দেওয়া হলো:
- ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন। খুলনা বা চিলাহাটির মতো বড় স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে সময় লাগতে পারে।
- দীর্ঘ যাত্রার এই ট্রেনে প্যান্ট্রি কার বা খাবারের বগি থাকে। তবুও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পর্যাপ্ত পানি সাথে রাখা ভালো।
- ভ্রমণের সময় অপরিচিত কারো দেওয়া কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করবেন না। নিজের মূল্যবান মালামাল যেমন মোবাইল, ল্যাপটপ বা ব্যাগ সবসময় চোখের সামনে রাখুন।
- ট্রেনের ভেতরে টিটিই (TTE) টিকিট চেক করতে এলে শান্তভাবে আপনার অরিজিনাল টিকিট বা ই-টিকিট প্রদর্শন করুন। টিকিট ছাড়া ভ্রমণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
- ট্রেনের বগি এবং স্টেশনের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা আমাদের দায়িত্ব। চিপসের প্যাকেট বা পানির বোতল যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনটি কি প্রতিদিন চলাচল করে?
না, সীমান্ত এক্সপ্রেস সপ্তাহে ৬ দিন চলাচল করে। প্রতি সপ্তাহের সোমবার এই ট্রেনের অফ ডে বা বন্ধের দিন।
খুলনা থেকে চিলাহাটি যেতে কত সময় লাগে?
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে খুলনা থেকে চিলাহাটি পৌঁছাতে প্রায় ৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় লাগে।
আমি কি অনলাইনে ট্রেনের সিট পছন্দ করতে পারব?
হ্যাঁ, রেল সেবা অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে টিকিট কাটার সময় আপনি খালি থাকা আসনগুলোর মধ্য থেকে আপনার পছন্দের সিটটি সিলেক্ট করতে পারবেন।
ট্রেনের খাবারে কি অতিরিক্ত মূল্য রাখা হয়?
সাধারণত বাংলাদেশ রেলওয়ে নির্ধারিত মূল্যের তালিকা খাবারের বগিতে টাঙানো থাকে। সেই তালিকার বাইরে অতিরিক্ত মূল্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
টিকিট রিফান্ড বা ফেরত দেওয়ার নিয়ম কী?
ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে টিকিট ফেরত দিলে সামান্য সার্ভিস চার্জ কেটে বাকি টাকা ফেরত পাওয়া যায়। তবে অনলাইন টিকিটের ক্ষেত্রে রিফান্ড প্রসেস কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
শেষ কথা
সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা আপনার উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি সুন্দর করে তুলতে পারে। খুলনা টু চিলাহাটি রুটের এই ট্রেনটি যেমন সাশ্রয়ী তেমনি নির্ভরযোগ্য। আমরা আমাদের এই নিবন্ধে সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী এবং ভাড়া সংক্রান্ত একদম আপডেট তথ্য ২০২৬ সালের জন্য প্রদান করেছি। আশা করি এই তথ্যগুলো আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনায় সঠিক সাহায্য করবে । ট্রেনের নিয়ম মেনে চলুন ও নিরাপদ ভ্রমণ উপভোগ করুন।



